সোমবার, ১লা আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ১৫ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

শ্রমবাজার পুনরায় চালু, অবৈধ কর্মীদের বৈধকরণ ও কনস্যুলার সেবা সম্প্রসারণে আশার আলো

ঢাকা | ১৪ জুন ২০২৬

মালয়েশিয়ায় বসবাসরত লাখ লাখ বাংলাদেশি প্রবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ এবং দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্ক আরও জোরদার করার লক্ষ্য নিয়ে আগামী ২১-২২ জুন মালয়েশিয়া সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। নতুন সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর এটিই তার প্রথম আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় সফর, যা বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সরকারের উচ্চপর্যায়ের সূত্র ও কুয়ালালামপুরস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশন জানিয়েছে, সফরের দ্বিতীয় দিনে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৈঠকে শ্রমবাজার, অভিবাসন, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি এবং আঞ্চলিক সহযোগিতাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনায় স্থান পেতে পারে।

শ্রমবাজার পুনরায় চালুর প্রত্যাশা

সফরটির অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় হতে পারে প্রায় দুই বছর ধরে বন্ধ থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়টি। বিভিন্ন অনিয়ম ও অভিযোগের কারণে ৩১ মে ২০২৪ থেকে সাধারণ কর্মী নিয়োগ স্থগিত রয়েছে। ফলে নতুন কর্মী পাঠানো এবং অপেক্ষমাণ হাজারো কর্মীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।

প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী সম্প্রতি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খুলে যাওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি হচ্ছে এবং খুব শিগগিরই বিষয়টি স্পষ্ট হবে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, সফরের সময় স্বচ্ছ, টেকসই ও সিন্ডিকেটমুক্ত নিয়োগব্যবস্থা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা হলে তা বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি ও রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

অবৈধ কর্মীদের বৈধকরণের দাবি

মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী বিভিন্ন কারণে সময়মতো ভিসা নবায়ন করতে না পেরে অনথিভুক্ত বা আনডকুমেন্টেড হয়ে পড়েছেন। প্রবাসী কমিউনিটি নেতারা আশা করছেন, সফরের সময় তাদের বৈধকরণের বিষয়ে ইতিবাচক আলোচনা হবে।

মালয়েশিয়া প্রবাসী কমিউনিটি নেতা ও এনসিপি ডায়াসপোরা অ্যালায়েন্সের আহ্বায়ক প্রকৌশলী এনামুল হক বলেন, দীর্ঘদিন ধরে অমীমাংসিত থাকা বিষয়গুলোর সমাধানে এই সফর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে আনডকুমেন্টেড বাংলাদেশিদের বৈধতার সুযোগ এবং কর্মীবান্ধব শ্রমবাজার প্রতিষ্ঠার বিষয়ে অগ্রগতি হলে তা হাজারো পরিবারের জন্য স্বস্তির খবর হবে।

কনস্যুলার সেবা সম্প্রসারণের দাবি

বর্তমানে অধিকাংশ কনস্যুলার সেবা কুয়ালালামপুরকেন্দ্রিক হওয়ায় দূরবর্তী অঞ্চলে কর্মরত বাংলাদেশিদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। সাবা, সারাওয়াক, পেনাং ও জহুর প্রদেশে স্থায়ী কনস্যুলার অফিস স্থাপনের দাবি দীর্ঘদিনের।

কেলান্তানে কর্মরত বাংলাদেশি কর্মী নাজিম উদ্দিন বলেন, একটি পাসপোর্ট বা কনস্যুলার সেবা নিতে অনেক সময় কয়েকদিনের ছুটি ও অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হয়। অনলাইন ও বিকেন্দ্রীভূত সেবার মাধ্যমে এই ভোগান্তি কমানো সম্ভব।

প্রবাসীদের মতে, কুয়ালালামপুরের বাইরে স্থায়ী কনস্যুলার দপ্তর স্থাপন করা হলে সময়, অর্থ ও শ্রম—তিন ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য সাশ্রয় হবে।

‘বাংলাদেশি স্কুল’ প্রতিষ্ঠার দাবি

দুবাই ও সৌদি আরবের আদলে মালয়েশিয়ায় একটি পূর্ণাঙ্গ ‘বাংলাদেশি স্কুল’ প্রতিষ্ঠার দাবিও জোরালো হয়েছে। দেশটিতে বসবাসরত বাংলাদেশি পরিবারের সন্তানদের মাতৃভাষা ও বাংলাদেশের শিক্ষাক্রমভিত্তিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন অভিভাবকরা।

বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনা

মালয়েশিয়া বর্তমানে বাংলাদেশের সপ্তম বৃহত্তম বিনিয়োগ অংশীদার। দুই দেশের মধ্যে বার্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ২ দশমিক ৯২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার হলেও বাংলাদেশের রপ্তানির তুলনায় আমদানির পরিমাণ অনেক বেশি।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ঝুলে থাকা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) বাস্তবায়ন এবং নতুন বিনিয়োগ উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো সম্ভব হবে। পাশাপাশি ড্রেজিং, স্মার্ট টানেল, সেমিকন্ডাক্টর শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে যৌথ সহযোগিতারও উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা রয়েছে।

শিক্ষার্থী ও দক্ষ জনশক্তির জন্য নতুন সুযোগ

বর্তমানে মালয়েশিয়ার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে হাজার হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন। শিক্ষাবিদদের মতে, পড়াশোনা শেষে ‘পোস্ট-স্টাডি ওয়ার্ক’ সুবিধা চালু করা গেলে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

শিক্ষাবিদ ড. এম নিয়াজ আসাদুল্লাহ মনে করেন, সফরে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য পোস্ট-স্টাডি ওয়ার্ক সুবিধা, সেমিকন্ডাক্টর ও আইটি খাতে দক্ষ প্রকৌশলী নিয়োগ এবং স্মার্ট কৃষি খাতে সহযোগিতা বিশেষ গুরুত্ব পাওয়া উচিত।

প্রবাসীদের মধ্যে আশাবাদ

মালয়েশিয়া যুবদলের সভাপতি জসিম উদ্দিন বলেন, সরকারপ্রধানের এই সফর শুধু কূটনৈতিক সম্পর্ক নয়, প্রবাসীদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সমস্যার সমাধানেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে শ্রমবাজারের স্থিতিশীলতা ও সম্প্রসারণে ইতিবাচক অগ্রগতি হবে বলে তারা আশাবাদী।

সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফর সফল হলে মালয়েশিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশিদের দীর্ঘদিনের অনেক দাবি বাস্তবায়নের পথ সুগম হবে। একই সঙ্গে বন্ধ শ্রমবাজার পুনরায় চালু, আনডকুমেন্টেড কর্মীদের বৈধকরণ এবং দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে।

প্রবাসীদের প্রত্যাশা এখন একটাই—এই সফর যেন কেবল কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তব ফলাফল বয়ে আনে এবং লাখো বাংলাদেশি কর্মীর জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা করে।

Leave A Reply

বৈদেশিক কর্মসংস্থান, অভিবাস ও প্রবাস জীবন সংক্রান্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল।

যোগাযোগ

সিটি হার্ট শপিং কমপ্লেক্স (১১তম ফ্লো), রুম ১২/৮, ৬৭, নয়াপল্টন, ভিআইপি রোড, ঢাকা-১০০০, ফোন: +৮৮০ ১৫৩৩-১৯০৩৭১, ইমেইল: info@probashbulletin.com

Exit mobile version