তারিখ: বৃহস্পতিবার, ২৭ নভেম্বর ২০২৫
স্টাফ রিপোর্টার | প্রবাস বুলেটিন
দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ অভূতপূর্ব মাত্রায় পৌঁছেছে। সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকগুলোর মোট বিতরণ করা ঋণের ৩৫.৭৩ শতাংশ এখন খেলাপি—যার পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৬ লাখ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
ব্যাংকারদের দাবি, অতীত সরকারের আমলে খেলাপি ঋণ কম দেখানোর প্রবণতা বন্ধ হওয়ায় প্রকৃত চিত্র এখন দৃশ্যমান হচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, পরিস্থিতি এতটাই নাজুক যে খেলাপি হার কিছুদিনের মধ্যে ৪০ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে।
অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতি
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী—
-
মোট ঋণ (সেপ্টেম্বর পর্যন্ত): ১৮ লাখ ৩ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা
-
মোট খেলাপি: প্রায় ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা
-
তিন মাসে খেলাপি বৃদ্ধি: ৩৬ হাজার ১৬৯ কোটি টাকা
২০০৯ সালে যেখানকার খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল মাত্র ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা, তা এখন বিশ গুণের বেশি।
“তথ্য গোপনের চেষ্টা বন্ধ হওয়ায় প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে এসেছে”
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক শিক্ষক মইনুল ইসলাম বলেন—
“শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে খেলাপি ঋণ কম দেখানোর অপপ্রয়াস ছিল। সঠিকভাবে হিসাব করায় এখন এর প্রকৃত হার প্রায় ৩৬ শতাংশ হয়েছে। কিছুদিনের মধ্যে ৪০ শতাংশও ছাড়িয়ে যেতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, ব্যাংকের শীর্ষ ১০ খেলাপির জন্য পৃথক ট্রাইব্যুনাল গঠন ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।
অনিয়ম–দুর্নীতির ফলে ঋণখেলাপির বিস্তার
ব্যাংকাররা জানান, গত দেড় দশকে ব্যাংক খাতে অনিয়ম, প্রতারণা, বড় ঋণ কেলেঙ্কারি ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের কারণে বর্তমান সংকট তৈরি হয়েছে।
উল্লেখযোগ্য কেলেঙ্কারি:
-
এস আলম গ্রুপ
-
বেক্সিমকো গ্রুপ
-
নাসা গ্রুপ
-
বিসমিল্লাহ গ্রুপ
-
হলমার্ক গ্রুপ
-
বেসিক ব্যাংক দুর্নীতি
এসব বড় খেলাপির কারণে ঋণ পুনরুদ্ধার প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
আইএমএফের পরামর্শে হিসাব পদ্ধতি কঠোর হয়েছে
আইএমএফের মানদণ্ড অনুযায়ী এখন ঋণ বকেয়া হওয়ার তিন মাস পরই খেলাপি হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।
আগে এ সময়সীমা ছিল ৯ মাস।
ফলে খেলাপির পরিমাণ আরও বেড়ে দেখা যাচ্ছে।
প্রভিশন ঘাটতি ভয়ংকর পর্যায়ে
ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) রাখতে পারছে না।
-
প্রভিশন ঘাটতি (সেপ্টেম্বর পর্যন্ত): ৩ লাখ ৪৪ হাজার ২৩১ কোটি টাকা
-
তিন মাসে বৃদ্ধি: ২৪ হাজার ৫১১ কোটি টাকা
এ ঘাটতি ভবিষ্যতে আমানতকারীদের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
যেসব ব্যাংক বেশি ঝুঁকিতে
-
জনতা ব্যাংক
-
অগ্রণী ব্যাংক
-
ন্যাশনাল ব্যাংক
-
আইএফআইসি ব্যাংক
-
একীভূত হতে যাওয়া পাঁচ ব্যাংক: ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক
এই পাঁচ ব্যাংকের দেড় লাখ কোটি টাকারও বেশি ঋণ খেলাপি।
অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ বলেন—
“বছরের পর বছর তথ্য গোপন করা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার আসার পর স্বচ্ছ হিসাব দেওয়ার নির্দেশ এসেছে। খেলাপি বাড়লেও এবার সত্য তথ্য প্রকাশ পাচ্ছে—এটাই ইতিবাচক দিক।”
উপসংহার
সাড়ে ৬ লাখ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ দেশের ব্যাংকিং খাতকে তীব্র ঝুঁকিতে ঠেলে দিয়েছে। প্রকৃত হিসাব প্রকাশের ফলে পুরো সংকট স্পষ্ট হলেও মূল সমস্যা রয়ে গেছে ঋণ পুনরুদ্ধার এবং দীর্ঘদিনের অনিয়ম।
অর্থনীতিবিদদের মতে, কঠোর আইন প্রয়োগ, পৃথক ট্রাইব্যুনাল এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যবস্থাপনা ছাড়া এ পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হবে।