প্রকাশের তারিখ: ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫
প্রতিবেদন | প্রবাস ডেস্ক
মালয়েশিয়ার নির্মাণ খাত দ্রুত সম্প্রসারণের পথে এগিয়ে চলেছে। একের পর এক মেগা অবকাঠামো প্রকল্প ও আবাসন উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে অর্থনৈতিক টেকসই উন্নয়ন ও জনসাধারণের সুবিধা নিশ্চিত করতে চায় দেশটির সরকার। তবে এসব প্রকল্প সময়মতো ও সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করতে দক্ষ ও পর্যাপ্ত শ্রমশক্তি নিশ্চিত করাকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ছয় লাখ বিদেশিকর্মীর ওপর নির্ভরতা
বর্তমানে মালয়েশিয়ার নির্মাণ খাতে প্রায় ৬ লাখ বিদেশিকর্মী নিয়োজিত রয়েছেন। এর মধ্যে বাংলাদেশ ও ইন্দোনেশিয়ার নাগরিকরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। স্থানীয় শ্রমবাজারে দক্ষ কর্মীর ঘাটতি পূরণে এসব বিদেশিকর্মী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
সিএলএবির ভূমিকা ও মূল্যায়ন
কনস্ট্রাকশন লেবার এক্সচেঞ্জ সেন্টার (সিএলএবি)-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা দাতুক আবদুল রফিক আবদুল রাজিস বলেন,
বিদেশি শ্রমিকদের উপস্থিতি শুধু বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে সহায়ক নয়, বরং স্থানীয় কর্মীদের জন্য নতুন দক্ষতা অর্জন ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগও তৈরি করছে।
শুক্রবার হরিয়ান মেট্রোকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, নির্মাণ খাত বর্তমানে একটি রূপান্তরকাল অতিক্রম করছে। বিদেশি কর্মীদের সুশৃঙ্খল ও পদ্ধতিগত ব্যবস্থাপনার ফলে অবৈধ শ্রমিক সমস্যাও নিয়ন্ত্রণে আসছে এবং একই সঙ্গে এই খাত স্থানীয়দের কাছেও ধীরে ধীরে আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।
দক্ষতা উন্নয়ন ও স্থানীয় কর্মীদের সুযোগ
আবদুল রফিক বলেন,
“বিদেশি কর্মীদের প্রশিক্ষণ, নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করে দক্ষভাবে পরিচালনা করা গেলে উপযুক্ত প্রণোদনার মাধ্যমে স্থানীয় কর্মীদেরও কেন এই খাতে আকৃষ্ট করা যাবে না?”
তিনি জানান, মালয়েশিয়ার নির্মাণ শিল্প উন্নয়ন বোর্ড (সিআইডিবি)-এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান সিএলএবি গত দুই দশক ধরে বিদেশি শ্রমিকদের বৈধ, নিরাপদ ও কার্যকর নিয়োগ এবং ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে।
অবৈধ শ্রমিক বৃদ্ধির ঝুঁকি
নির্মাণ প্রকল্প সাধারণত এক থেকে দুই বছরের মধ্যে শেষ হয়। ফলে অনেক শ্রমিক পরবর্তী প্রকল্পে স্থানান্তরের সুযোগ না পেয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েন, যা পরবর্তীতে অবৈধ শ্রমিক বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই সমস্যার সমাধানেই শ্রমিক বিনিময় কেন্দ্র হিসেবে সিএলএবি প্রতিষ্ঠা করা হয় বলে জানান তিনি।
আবদুল রফিক আরও বলেন,
প্রতি বছর প্রায় ১০ শতাংশ বিদেশি কর্মী নিজ দেশে ফিরে যান। তবে নতুন নিয়োগে স্থগিতাদেশ (মোরাটোরিয়াম) থাকায় সেই শূন্যতা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
দক্ষতার ঘাটতি বড় উদ্বেগ
তার মতে, চলমান ও আসন্ন সরকারি-বেসরকারি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে বিদ্যমান ছয় লাখ বিদেশিকর্মী অপরিহার্য। তবে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এদের মধ্যে মাত্র ৫ শতাংশের কাছে সিআইডিবি স্বীকৃত দক্ষতা সনদ রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে সিএলএবি বৈধ ও চাহিদাভিত্তিক বিদেশিকর্মী নিয়োগে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানটি কর্মী পারমিট, নিয়োগ চুক্তি ও কল্যাণ তদারকির দায়িত্ব পালন করছে, যাতে নিয়োগকর্তারা আইনগত ঝুঁকি ছাড়াই দক্ষ শ্রমিক পান এবং শ্রমিকরাও ন্যায্য অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারেন।
‘গ্রিন কার্ড’ ও ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা
শ্রম ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনতে সিএলএবি চালু করেছে নির্মাণ কর্মী পরিচয়পত্র ‘গ্রিন কার্ড’, যা ‘ই-ওয়েজেস’ ব্যবস্থার সঙ্গে সংযুক্ত। এর মাধ্যমে—
-
বেতন পরিশোধে স্বচ্ছতা
-
কিউআর কোড স্ক্যানের মাধ্যমে নির্মাণ সাইটে প্রবেশ
-
দক্ষতার স্বীকৃতি
-
উপস্থিতি ও কাজের নজরদারি
সহজ ও কার্যকরভাবে সম্পন্ন হচ্ছে।
আবদুল রফিক বলেন, গ্রিন কার্ড ব্যবস্থার ফলে শ্রম ব্যবস্থাপনা আরও পেশাদার ও কার্যকর হয়েছে। এটি শুধু বিদেশি শ্রমিকদের শোষণ থেকে রক্ষা করছে না, বরং স্থানীয় কর্মীদের প্রশিক্ষণ ও বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগও তৈরি করছে।
দক্ষতা সনদ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
এছাড়া স্কিলড ওয়ার্কার কম্পিটেন্সি সার্টিফিকেট (এসকেকেপি) কর্মসূচির মাধ্যমে দেশি-বিদেশি উভয় শ্রমিকের দক্ষতা যাচাই ও স্বীকৃতি নিশ্চিত করা হচ্ছে। এতে কাজের মান ও কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে জানান তিনি।
উপসংহার
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত বিদেশি শ্রমশক্তি শুধু মালয়েশিয়ার মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নেই নয়, বরং একটি স্বচ্ছ, দক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক নির্মাণ খাত গড়ে তুলতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সিএলএবি, গ্রিন কার্ড ও এসকেকেপির মতো কাঠামোগত উদ্যোগ ভবিষ্যতে স্থানীয় কর্মীদের জন্যও নির্মাণ খাতকে একটি সম্ভাবনাময় ও দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
