কুয়ালালামপুর, ১ জুলাই ২০২৬
মালয়েশিয়ায় বিদেশি কর্মী নিয়োগ ব্যবস্থার জন্য প্রস্তাবিত ইউনিভার্সাল রিক্রুটমেন্ট অ্যাডভান্সড প্ল্যাটফর্ম (TURAP) চালুর উদ্যোগকে কেন্দ্র করে নতুন রাজনৈতিক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। প্রকল্পটির স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, আর্থিক কাঠামো এবং সরকারি অনুমোদন নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলে এর বাস্তবায়ন অবিলম্বে স্থগিত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন দেশটির সাতজন সংসদ সদস্য (এমপি)।
সোমবার (২৯ জুন) প্রকাশিত এক যৌথ বিবৃতিতে এমপিরা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কিত ফরেন ওয়ার্কার্স সেন্ট্রালাইজড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (FWCMS) নিয়ে উত্থাপিত সুশাসন ও জবাবদিহির প্রশ্নগুলোর সমাধান না করেই নতুন একটি কেন্দ্রীয় নিয়োগ প্ল্যাটফর্ম চালুর উদ্যোগ উদ্বেগজনক।
মন্ত্রিসভার অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন
বিবৃতিতে এমপিরা জানতে চান, তুরাপ প্রকল্পটি আদৌ মন্ত্রিসভার আনুষ্ঠানিক অনুমোদন পেয়েছে কি না। যদি অনুমোদন দেওয়া হয়ে থাকে, তবে কেন আবারও বিদেশি কর্মী নিয়োগ ব্যবস্থায় বেস্টিনেটকে কেন্দ্রীয় ভূমিকায় আনা হচ্ছে—সে বিষয়ে সরকারকে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়ার দাবি জানান তারা।
তাদের মতে, তুরাপ শুধু একটি প্রযুক্তিগত প্ল্যাটফর্ম নয়; এটি বিদেশি কর্মী নিয়োগ, নিয়োগকর্তার সঙ্গে সংযুক্তি, অভিবাসন প্রক্রিয়া, কর্মী স্থানান্তর, নিয়োগ ব্যয়, শ্রম অধিকার এবং লাখ লাখ কর্মীর ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। ফলে জনপরামর্শ ও পূর্ণ স্বচ্ছতা ছাড়া এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা উচিত নয়।
‘ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মই একমাত্র সমাধান নয়’
যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, তুরাপের ঘোষিত উদ্দেশ্য হলো দালালচক্রের প্রভাব কমিয়ে সরাসরি নিয়োগকর্তা ও কর্মীদের মধ্যে সংযোগ স্থাপন এবং নিয়োগ ব্যয় হ্রাস করা।
তবে এমপিদের মতে, কেবল একটি নতুন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু করলেই কাঙ্ক্ষিত সংস্কার নিশ্চিত হবে না। কার্যকর নজরদারি, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহির অভাব থাকলে পুরোনো শোষণব্যবস্থাই নতুন রূপে ফিরে আসতে পারে।
এফডব্লিউসিএমএস নিয়ে পুরোনো বিতর্ক
বিবৃতিতে সংসদ সদস্যরা স্মরণ করিয়ে দেন, পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি (PAC)-এর প্রতিবেদনে এফডব্লিউসিএমএস পরিচালনায় একাধিক গুরুতর অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ছয় বছরেরও বেশি সময় সরকার ও বেস্টিনেটের মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি ছাড়াই সিস্টেমটি পরিচালিত হয়েছে। এছাড়া সুপার অ্যাডমিন আইডির নিয়ন্ত্রণ, অননুমোদিত ব্যক্তির মাধ্যমে আবেদন অনুমোদন এবং বিভিন্ন নিরাপত্তা দুর্বলতার বিষয়ও প্রতিবেদনে চিহ্নিত করা হয়েছিল।
একই সঙ্গে ২০২২ সালের অডিটর জেনারেলের প্রতিবেদনে এফডব্লিউসিএমএস ব্যবস্থাপনাকে অসন্তোষজনক হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
বেস্টিনেটের নতুন চুক্তি নিয়েও প্রশ্ন
বিতর্কের মধ্যেই মালয়েশিয়া সরকার ২০২৪ সালের জুন থেকে ২০৩১ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত বেস্টিনেটের সঙ্গে নতুন চুক্তি করে। ওই চুক্তিতে প্রতি বিদেশি কর্মীর জন্য নির্ধারিত ফি ১০০ রিঙ্গিত থেকে বাড়িয়ে ২১৫ রিঙ্গিত করা হয়।
এ অবস্থায় একই প্রতিষ্ঠানের হাতে আবারও বিদেশি কর্মী নিয়োগের নতুন জাতীয় প্ল্যাটফর্মের দায়িত্ব দেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এমপিরা।
উন্মুক্ত দরপত্রের দাবি
আইনপ্রণেতাদের দাবি, তুরাপ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অবশ্যই উন্মুক্ত দরপত্র (Open Tender) অথবা স্বচ্ছ রিকোয়েস্ট ফর প্রপোজাল (RFP) প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।
তাদের মতে, শুধু এফডব্লিউসিএমএস পরিচালনার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে কোনো প্রতিষ্ঠানকে সরাসরি দায়িত্ব দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।
একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের আশঙ্কা
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, তুরাপ চালু হলে বিদেশি কর্মী নিয়োগের পুরো প্রক্রিয়া—উৎস দেশে নিয়োগ, নিয়োগকর্তার সঙ্গে সংযুক্তি, প্রবেশ অনুমোদন, পারমিট নবায়ন এবং কর্মীদের তথ্য ব্যবস্থাপনা—একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে পারে।
এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে একচেটিয়া ব্যবসায়িক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তারা।
ব্যয় বাড়ার শঙ্কা
গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে এমপিরা দাবি করেন, বেস্টিনেটের প্রস্তাবিত প্রকল্পটি ১২ বছরের চুক্তির আওতায় হতে পারে এবং প্রতি বিদেশি কর্মীর আবেদনে প্রায় ১ হাজার মার্কিন ডলার (প্রায় ৩ হাজার ৯৫০ রিঙ্গিত) পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে।
এছাড়া একজন কর্মীর এক মাসের বেতনের সমপরিমাণ অতিরিক্ত ফি আরোপের সম্ভাবনার কথাও আলোচনায় এসেছে।
যদিও এসব প্রস্তাব এখনো চূড়ান্ত হয়নি, তবুও সম্ভাব্য ব্যয় বৃদ্ধি, অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহার এবং কর্মীবান্ধব সংস্কার নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আইনপ্রণেতারা।
সরকারের কাছে আট দফা প্রশ্ন
এমপিরা সরকারের কাছে আটটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জবাব দাবি করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে—
- তুরাপ প্রকল্পের মন্ত্রিসভা অনুমোদনের বর্তমান অবস্থা;
- বেস্টিনেটকে দায়িত্ব দেওয়ার ভিত্তি;
- উন্মুক্ত দরপত্র না হওয়ার কারণ;
- প্রকল্পের আর্থিক কাঠামো;
- বিদেশি কর্মীদের তথ্যের মালিকানা ও সুরক্ষা;
- নতুন প্ল্যাটফর্মের প্রয়োজনীয়তার যৌক্তিকতা।
সংস্কার চান, একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ নয়
যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, মালয়েশিয়ার বিদেশি কর্মী নিয়োগ ব্যবস্থায় প্রকৃত সংস্কার প্রয়োজন। অতিরিক্ত নিয়োগ ব্যয়, ঋণের বোঝা, দালালচক্রের শোষণ এবং প্রতিশ্রুত চাকরি না পাওয়ার মতো দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলোর স্থায়ী সমাধান করতে হবে।
তবে সংস্কারের নামে বহু দালালের পরিবর্তে একটি শক্তিশালী বেসরকারি একচেটিয়া প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলেও মন্তব্য করেন তারা।
তথ্য প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত স্থগিতের আহ্বান
সংসদ সদস্যরা সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, সংসদ ও জনগণের সামনে তুরাপ প্রকল্পের সব তথ্য প্রকাশ না করা পর্যন্ত এর বাস্তবায়ন স্থগিত রাখা হোক।
একই সঙ্গে প্রকল্পের ক্রয়প্রক্রিয়া, ব্যয়ের কাঠামো, তথ্য সুরক্ষা, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (PPP) কাঠামো এবং কর্মী সুরক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশেরও দাবি জানান তারা।
যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন পেতালিং জয়ার এমপি লি চিয়ান চুং, সুবাংয়ের এমপি ওং চেন, ওয়াংসা মাজুর এমপি জাহির হাসান, বালিক পুলাউয়ের এমপি মুহাম্মদ বখতিয়ার ওয়ান চিক, আমপাংয়ের এমপি রোদজিয়াহ ইসমাইল, সুংগাই সিপুতের এমপি কেসাভান সুব্রামানিয়াম এবং গোপেংয়ের এমপি তান কার হিং।
এই প্রতিবেদনটি আপনার “প্রবাস বুলেটিন”-এর প্রকাশভঙ্গির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি করা হয়েছে। চাইলে এটিকে আরও অনুসন্ধানধর্মী (investigative) বা বিশ্লেষণধর্মী (analysis) সংস্করণেও রূপান্তর করা যেতে পারে।
