কুয়ালালামপুর, ৫ জুলাই ২০২৬:

হাজার মাইল দূরে প্রবাসজীবনের ব্যস্ততার মধ্যেও বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের বন্ধন অটুট রাখা এবং প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের কাছে শেকড়ের পরিচয় তুলে ধরার প্রত্যয়ে মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত হয়েছে বাংলাদেশ ফোরাম অ্যাসোসিয়েশন (এমবিএফএ) আয়োজিত ফ্যামিলি ঈদ ডিনার ও কালচারাল নাইট

শনিবার (৪ জুলাই) রাজধানী কুয়ালালামপুরের বুকিত কিয়ারার কুয়েস্ট্রেইন রিসোর্টের বীরজায়া হলে অনুষ্ঠিত এ আয়োজনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশনের মিনিস্টার (লেবার) সিদ্দিকুর রহমান।

এমবিএফএ’র সাংগঠনিক সম্পাদক জাফর ফিরোজ ও অপূর্ব মোহনার যৌথ সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি অধ্যাপক ড. জাহাঙ্গীর আলম। স্বাগত বক্তব্য দেন সংগঠনের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার বিভিন্ন অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তি, কূটনীতিক, কমিউনিটি নেতা, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী, শিক্ষার্থী, পরিবার-পরিজনসহ বিপুলসংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশি অংশ নেন। ঈদ পুনর্মিলনীর আবহে পুরো আয়োজনটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ও ঐক্যের এক প্রাণবন্ত মিলনমেলায় পরিণত হয়।

পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা করেন এমবিএফএ’র আর্ট, কালচার অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ প্রোগ্রামের (এসিএলপি) শিক্ষার্থী মোহাম্মদ রাহেব আল আলম। পরে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়। নতুন সদস্য পরিচিতি, সংগঠনের বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন, অতিথিদের বক্তব্য এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখা ব্যক্তিদের সম্মাননা প্রদানের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে।

আয়োজনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল সাংস্কৃতিক পর্ব। বাংলাদেশি ও মালয়েশিয়ান শিল্পী পুয়ান শ্রী আইশা এবং চিক পুয়ান হানিমের পরিবেশনা দর্শকদের মুগ্ধ করে। এছাড়া এসিএলপির শিশু-কিশোর শিক্ষার্থীদের গান, নৃত্য ও আবৃত্তিতে ফুটে ওঠে বাংলা ভাষা, লোকসংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের নানা অনুষঙ্গ। র‍্যাফেল ড্র, পারিবারিক আড্ডা ও নৈশভোজে উৎসবের আমেজ আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। র‍্যাফেল ড্র পরিচালনা করেন ইঞ্জিনিয়ার রনি মিনহাজ।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে মিনিস্টার (লেবার) সিদ্দিকুর রহমান বলেন, বিদেশে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের মধ্যে বাংলা ভাষা, শিল্প ও সংস্কৃতির চর্চা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রবাসে জন্ম নেওয়া শিশুদের মাতৃভাষা ও সাংস্কৃতিক পরিচয় ধরে রাখতে এ ধরনের উদ্যোগ কার্যকর ভূমিকা পালন করবে।

তিনি এমবিএফএ’র উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে বাংলাদেশের ভাষা, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে পৌঁছে দিতে এ ধরনের আয়োজন সময়োপযোগী। একই সঙ্গে তিনি সাংস্কৃতিক কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করার পাশাপাশি প্রবাসীদের কল্যাণে সংগঠনের ভূমিকা জোরদারের আহ্বান জানান।

সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, এই সফল আয়োজন প্রমাণ করেছে যে প্রবাসে বসবাসরত বাংলাদেশিরা ঐক্য, সহযোগিতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী কমিউনিটি গড়ে তুলতে সক্ষম। ভবিষ্যতেও এমবিএফএ বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার বন্ধুত্ব, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং প্রবাসী কমিউনিটির উন্নয়নে বিভিন্ন কর্মসূচি অব্যাহত রাখবে।

অনুষ্ঠানে বক্তারা প্রবাসের মাটিতে ঐক্যবদ্ধভাবে বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরা এবং নিজ নিজ অবস্থান থেকে দেশকে ব্র্যান্ডিং করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে প্রবাসী সমাজে পারস্পরিক সহযোগিতা, সামাজিক সম্প্রীতি ও সাংস্কৃতিক চর্চা আরও সম্প্রসারণের আহ্বান জানান।

অনুষ্ঠানের সফল বাস্তবায়নে সহযোগিতার জন্য এমবিএফএ’র সদস্য, কার্যনির্বাহী কমিটি, স্বেচ্ছাসেবক, স্পন্সর, অংশীদার, শিল্পী, গণমাধ্যমকর্মী এবং উপস্থিত অতিথিদের প্রতি সংগঠনের পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়।

এক দশকের বেশি সময় ধরে প্রবাসী কমিউনিটির পাশে এমবিএফএ

২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ ফোরাম অ্যাসোসিয়েশন (এমবিএফএ) বর্তমানে মালয়েশিয়ায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের অন্যতম বৃহৎ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন হিসেবে পরিচিত। মালয়েশিয়ার রেজিস্ট্রার অব সোসাইটিজ (আরওএস)-এ নিবন্ধিত অরাজনৈতিক ও ধর্মনিরপেক্ষ এ সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষায় বিভিন্ন কর্মসূচি পরিচালনা করে আসছে।

সংগঠনের নেতাদের মতে, এক দশকেরও বেশি সময়ের ধারাবাহিক কর্মকাণ্ডের ফলে এমবিএফএ প্রবাসী বাংলাদেশিদের পারস্পরিক যোগাযোগ, সামাজিক বন্ধন ও সাংস্কৃতিক চর্চার অন্যতম নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে।

নতুন প্রজন্মের জন্য ভাষা ও সংস্কৃতির পাঠ

প্রবাসে জন্ম নেওয়া শিশু-কিশোরদের বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে ২০১৯ সালের নভেম্বরে কুয়ালালামপুরে চালু করা হয় এমবিএফএ’র আর্ট, কালচার অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ প্রোগ্রাম (এসিএলপি)। সংগীত, নৃত্য ও বাংলা ভাষা শিক্ষার সমন্বয়ে পরিচালিত এই কর্মসূচির মাধ্যমে শিশুদের শেকড়ের সঙ্গে পরিচিত করার পাশাপাশি তাদের মধ্যে বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয় ও মূল্যবোধ গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বর্তমানে এসিএলপি নিয়মিত প্রশিক্ষণের পাশাপাশি বিভিন্ন জাতীয় দিবস ও বিশেষ উপলক্ষে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব কার্যক্রম শিশুদের আত্মবিশ্বাস, সৃজনশীলতা এবং মাতৃভাষার প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।

অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া প্রবাসী বাংলাদেশিদের অভিমত, এমবিএফএ’র এ ধরনের আয়োজন শুধু বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং নতুন প্রজন্মের মধ্যে বাংলাদেশের ইতিহাস, ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা গড়ে তোলার একটি কার্যকর উদ্যোগ। একই সঙ্গে মালয়েশিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটির মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি, সামাজিক বন্ধন ও ঐক্য আরও সুদৃঢ় করতে এ ধরনের আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

প্রবাসীদের প্রত্যাশা, এমবিএফএ’র ধারাবাহিক সাংস্কৃতিক ও শিক্ষামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির বিকাশে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাদের শেকড়ের সঙ্গে আরও গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।

Leave A Reply

বৈদেশিক কর্মসংস্থান, অভিবাস ও প্রবাস জীবন সংক্রান্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল।

যোগাযোগ

সিটি হার্ট শপিং কমপ্লেক্স (১১তম ফ্লো), রুম ১২/৮, ৬৭, নয়াপল্টন, ভিআইপি রোড, ঢাকা-১০০০, ফোন: +৮৮০ ১৫৩৩-১৯০৩৭১, ইমেইল: info@probashbulletin.com

Exit mobile version