ঢাকা | ২০ জুন ২০২৬
সরকার গঠনের প্রায় চার মাস পর প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়া ও চীন যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আগামীকাল রোববার বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটে তিনি ঢাকা ত্যাগ করবেন। সফরের প্রথম গন্তব্য মালয়েশিয়া এবং পরে চীন সফর করবেন তিনি। দুই দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক, শ্রমবাজার ও কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করাই এ সফরের মূল লক্ষ্য বলে জানা গেছে।
প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, মালয়েশিয়ার দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা শ্রমবাজার পুনরায় চালু করা এবং শ্রমিক নিয়োগে বিদ্যমান জটিলতার সমাধান তার সফরের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। পাশাপাশি চীন সফরে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় বেইজিংয়ের সহযোগিতা এবং বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ বৃদ্ধির বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, “মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে যে জটিলতা চলছে তার অবসান ঘটাতে চেষ্টা করব। পাশাপাশি রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান এবং দেশে আরও বেশি চীনা বিনিয়োগ আনতে চাই।”
শ্রমবাজারে গুরুত্ব
সরকারি সূত্রগুলো জানিয়েছে, মালয়েশিয়া সফরে শ্রমবাজার উন্মুক্তকরণ, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ এবং অবৈধ বা অনিয়মের শিকার বাংলাদেশি কর্মীদের সমস্যা সমাধানের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।
প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে বলেন, বিদেশে আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে অন্যায়ভাবে কারাবন্দি বাংলাদেশিদের বিষয়ে মালয়েশিয়া সরকারের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।
বিএনপির প্রবাসীকল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক এমপি বলেন, “আমরা চাই মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার সিন্ডিকেটমুক্ত হোক, যাতে কম খরচে কর্মীরা বিদেশে যেতে পারেন।”
একই দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিস (বায়রা)। সংগঠনটির ৬৫ জন সদস্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো এক আবেদনে শ্রমবাজারকে সিন্ডিকেটমুক্ত ও সব বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
বায়রার সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ফখরুল ইসলাম বলেন, নেপালসহ অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশ থেকেও উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক পদ্ধতিতে কর্মী পাঠানোর সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
মালয়েশিয়ায় সম্ভাব্য সমঝোতা
প্রধানমন্ত্রীর সফরসূচি অনুযায়ী, ২১ ও ২২ জুন মালয়েশিয়ায় অবস্থান করবেন তিনি। সেখানে শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং সন্ত্রাস দমনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তিনটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে আরও গুরুত্ব দেওয়া হবে মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত অনিয়মিত বাংলাদেশি কর্মীদের বৈধতার সুযোগ সৃষ্টি এবং উচ্চশিক্ষায় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরির বিষয়ে।
চীনে রোহিঙ্গা ও বিনিয়োগ ইস্যু
মালয়েশিয়া সফর শেষে ২২ জুন বিকেলে চীনের উপকূলীয় শহর দালিয়ানের উদ্দেশে রওনা দেবেন প্রধানমন্ত্রী। ২৩ থেকে ২৫ জুন পর্যন্ত চীনে একাধিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক ও আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো জানিয়েছে, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় চীনের সক্রিয় সহযোগিতা চাওয়া হবে। একই সঙ্গে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) কাঠামোর আওতায় বাণিজ্য, অবকাঠামো, ডিজিটাল অর্থনীতি, জ্বালানি ও শিল্প খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হবে।
চীন সফরে প্রায় ১০ থেকে ১৫টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এর মধ্যে বাণিজ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং বিনিয়োগ সহযোগিতা উল্লেখযোগ্য।
বিনিয়োগ ও অবকাঠামো সহযোগিতা
চীনে অবস্থানকালে প্রধানমন্ত্রী বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) বার্ষিক সভায় অংশ নেবেন। এছাড়া চীনের বৃহৎ অবকাঠামো ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করবেন।
চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন করপোরেশন, চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশন এবং চায়না মেশিনারি ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশনের সঙ্গে সম্ভাব্য বৈঠকে রেলপথ, সেতু, বিদ্যুৎ এবং শিল্পায়ন প্রকল্পে বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা হবে।
২৫ জুন বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ বিনিয়োগ ফোরামে অংশ নিয়ে শতাধিক সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীর সামনে বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনা তুলে ধরবেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় চীনের অটোমোবাইল, বস্ত্র ও শিল্প খাতের বড় কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রত্যাশা সরকারের
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেন, “প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হতে পারে। একই সঙ্গে চীন সফরে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ও বিনিয়োগ সহযোগিতায় ইতিবাচক ফল আসবে বলে আমরা আশা করছি।”
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই দুই দেশের সফর শ্রমবাজার, বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং কূটনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।
