ঢাকা, ২৪ জুন ২০২৬
প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিনিয়োগে উৎসাহ দেওয়া এবং বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানোর লক্ষ্যে অফশোর ব্যাংকিং কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন ব্যবস্থার আওতায় এখন থেকে প্রবাসীরা অফশোর ব্যাংকিং ইউনিটের (ওবিইউ) মাধ্যমে ‘অনিবাসী বিনিময়যোগ্য টাকা হিসাব’ (Non-Resident Convertible Taka Account) খুলতে পারবেন। এ হিসাবে জমাকৃত অর্থ ও অর্জিত মুনাফা যেকোনো সময় বিদেশে স্থানান্তর করার সুযোগ থাকবে।
মঙ্গলবার (২৩ জুন) এ-সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করে দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং অফশোর ব্যাংকিং কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করতেই এ নতুন সুবিধা চালু করা হয়েছে।
যেভাবে হিসাব খোলা যাবে
সার্কুলার অনুযায়ী, বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রার বিপরীতে প্রবাসীরা এ হিসাব খুলতে পারবেন। হিসাবটি সঞ্চয়ী, চলতি অথবা বিভিন্ন মেয়াদি আমানত হিসাব হিসেবে পরিচালনা করা যাবে।
এ হিসাবে রেমিট্যান্সের অর্থ ছাড়াও অন্যান্য অনিবাসী হিসাব থেকে স্থানান্তরিত অর্থ, আমানতের বিপরীতে অর্জিত সুদ বা মুনাফা, বাংলাদেশে অনুমোদিত বিনিয়োগ থেকে প্রাপ্ত আয় এবং শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের লভ্যাংশ বা রিফান্ড জমা রাখা যাবে।
মূলধন ও মুনাফা বিদেশে নেওয়ার পূর্ণ সুযোগ
নতুন হিসাবের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এর পূর্ণ প্রত্যাবাসনযোগ্যতা। অর্থাৎ, হিসাবে জমাকৃত মূলধন এবং অর্জিত সুদ বা মুনাফা কোনো ধরনের বিধিনিষেধ ছাড়াই বিদেশে স্থানান্তর করা যাবে।
ফলে প্রবাসীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করলেও অর্থ ফেরত পাওয়ার বিষয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগতে হবে না। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এ সুবিধা বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশিদের দেশে বিনিয়োগে আরও বেশি আগ্রহী করে তুলবে।
দেশে বিনিয়োগ ও লেনদেনের সুযোগ
এ হিসাবের অর্থ বিদেশে স্থানান্তরের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরেও বিভিন্ন খাতে ব্যবহার করা যাবে। এর মধ্যে রয়েছে—
- সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই)
- পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ
- স্থানীয় লেনদেন পরিশোধ
- অন্যান্য বৈদেশিক মুদ্রা হিসাবের সঙ্গে রূপান্তর বা স্থানান্তর
এ ছাড়া হিসাবের তহবিল ব্যবহার করে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা), বাংলাদেশ রফতানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা) এবং বাংলাদেশ কোরিয়ান ইপিজেড (বিকেইপিজেড)-এর আওতাভুক্ত ‘টাইপ-এ’ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে স্থানীয় মুদ্রায় ঋণ দেওয়া যাবে।
তবে এসব ঋণ কেবল বেতন-ভাতা, মজুরি, ইউটিলিটি বিলসহ চলতি পরিচালন ব্যয় মেটাতে ব্যবহার করা যাবে এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের রফতানি আয় থেকে তা পরিশোধ করতে হবে।
প্রবাসীদের জন্য ঋণ সুবিধাও
নতুন বিধান অনুযায়ী, প্রবাসীরা তাদের হিসাবের জমাকৃত অর্থকে জামানত হিসেবে ব্যবহার করে দেশের স্থানীয় ব্যাংকিং ইউনিট থেকে নিজের নামে অথবা মনোনীত ব্যক্তির নামে ঋণ সুবিধা নিতে পারবেন।
এই ঋণ ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক—উভয় ধরনের কাজে ব্যবহার করা যাবে, যা দেশে বিনিয়োগ ও উদ্যোক্তা কার্যক্রমে প্রবাসীদের অংশগ্রহণ আরও সহজ করবে।
কিছু খাতে বিনিয়োগে সীমাবদ্ধতা
তবে বাংলাদেশ ব্যাংক কিছু ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। জামানতের বিপরীতে নেওয়া ঋণের অর্থ কৃষি, প্ল্যান্টেশন ও রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় বিনিয়োগ করা যাবে না।
তবে প্রবাসীরা চাইলে নিজস্ব ব্যবহারের জন্য আবাসিক সম্পত্তি ক্রয় অথবা অ-প্রত্যাবাসনযোগ্য বিনিয়োগে এ অর্থ ব্যবহার করতে পারবেন।
রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ার আশা
ব্যাংকিং ও ব্যবসায়িক খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশ ব্যাংকের এ উদ্যোগ প্রবাসীদের জন্য দেশের আর্থিক খাতে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করবে। একই সঙ্গে বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠাতে আরও উৎসাহ জোগাবে এবং অফশোর ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে অধিক কার্যকর করে তুলবে।
সংশ্লিষ্টদের ধারণা, নতুন এ সুবিধা বিশেষায়িত অর্থনৈতিক অঞ্চলভিত্তিক শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর স্বল্পমেয়াদি তারল্য সংকট মোকাবিলায়ও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
