ঢাকা, ১৭ জুন ২০২৬:
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালু হওয়া বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর চেয়েও বেশি জরুরি একটি টেকসই, স্বচ্ছ ও দক্ষ অভিবাসন কাঠামো গড়ে তোলা বলে মনে করছেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, বারবার শ্রমবাজার খোলা ও বন্ধ হওয়ার চক্র থেকে বেরিয়ে এসে বাংলাদেশকে এখন দক্ষ জনশক্তি, প্রযুক্তিনির্ভর নিয়োগব্যবস্থা এবং প্রবাসীকেন্দ্রিক অভিবাসন নীতির দিকে এগোতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন মালয়েশিয়া সফরকে ঘিরে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর মাইগ্রেশন স্টাডিজের সহযোগী অধ্যাপক ও সমন্বয়ক ড. সেলিম রেজা বলেন, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর সম্ভাবনা, অনথিভুক্ত বাংলাদেশিদের বৈধকরণ এবং প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান নিয়ে ব্যাপক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। তবে কেবল শ্রমবাজার খুলে যাওয়াকে সাফল্য হিসেবে দেখলে হবে না; অভিবাসন ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতাগুলোর সমাধান নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, গত দুই দশকে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার একাধিকবার চালু ও বন্ধ হয়েছে। ২০০৮, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালে বাজার স্থগিত হওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে যে সমস্যাটি কেবল শ্রমবাজারে প্রবেশাধিকার নয়, বরং নিয়োগব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার সঙ্গেও জড়িত।
সিন্ডিকেটমুক্ত নিয়োগব্যবস্থার ওপর জোর
বিশ্লেষণে বলা হয়, অতীতে কিছু প্রভাবশালী রিক্রুটিং এজেন্সির একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের কারণে শ্রমিকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, ভুয়া চাকরির প্রতিশ্রুতি এবং চুক্তি লঙ্ঘনের মতো ঘটনা ঘটেছে। ফলে অনেক কর্মী ঋণগ্রস্ত হয়ে বিদেশে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
ড. সেলিম রেজা মনে করেন, এবারের আলোচনায় বাংলাদেশের অন্যতম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত সিন্ডিকেটমুক্ত, প্রযুক্তিনির্ভর ও স্বচ্ছ নিয়োগব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা। কর্মী নির্বাচন, চাকরির চুক্তি, নিয়োগকর্তার তথ্য, ভিসা প্রক্রিয়া এবং অভিবাসন ব্যয় অনলাইনে উন্মুক্ত ও যাচাইযোগ্য করার প্রস্তাবও তুলে ধরা উচিত।
দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে নতুন উদ্যোগের আহ্বান
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভবিষ্যতের শ্রমবাজারে অদক্ষ শ্রমিকের পরিবর্তে দক্ষ কর্মীর চাহিদা বাড়বে। মালয়েশিয়া বর্তমানে সেমিকন্ডাক্টর, বৈদ্যুতিক যানবাহন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ডেটা সেন্টার এবং স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে।
এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে ইলেকট্রিক্যাল ও মেকানিক্যাল টেকনিশিয়ান, শিল্প অটোমেশন অপারেটর, উন্নত ওয়েল্ডিং বিশেষজ্ঞ, সৌরবিদ্যুৎ প্রযুক্তিবিদ এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতের দক্ষ জনবল তৈরিতে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর সফরে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া যৌথ দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি এবং শিল্প খাতভিত্তিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের বিষয়টি গুরুত্ব পেতে পারে বলেও মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
অনথিভুক্ত বাংলাদেশিদের বৈধকরণের দাবি
মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত অনথিভুক্ত বাংলাদেশিদের একটি বড় অংশ নিয়োগকর্তার প্রতারণা, কোম্পানি বন্ধ হয়ে যাওয়া অথবা প্রশাসনিক জটিলতার কারণে বৈধতা হারিয়েছেন উল্লেখ করে বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, তাদের জন্য বিশেষ বৈধকরণ কর্মসূচি চালুর বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জরিমানা বা নির্দিষ্ট শর্ত পূরণের মাধ্যমে এসব কর্মীকে বৈধ মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়া হলে তা মানবিক ও অর্থনৈতিক—উভয় দিক থেকেই ইতিবাচক হবে।
কনস্যুলার সেবা সম্প্রসারণের সুপারিশ
মালয়েশিয়ার বিভিন্ন প্রদেশে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশিদের কনস্যুলার সেবা পেতে এখনও কুয়ালালামপুরে যেতে হয়। ফলে সময় ও অর্থ ব্যয় বাড়ছে। এ অবস্থায় আঞ্চলিক কনস্যুলার সেবাকেন্দ্র, মোবাইল কনস্যুলার সেবা এবং পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সেবা চালুর সুপারিশ করা হয়েছে।
‘শ্রম রপ্তানি’ নয়, ‘দক্ষতা রপ্তানি’র ওপর গুরুত্ব
ড. সেলিম রেজা বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিকস ও অটোমেশনের কারণে আগামী দশকে বিশ্ব শ্রমবাজারে বড় পরিবর্তন আসবে। তাই শুধু বেশি সংখ্যক শ্রমিক পাঠানোর পরিবর্তে বেশি দক্ষ কর্মী পাঠিয়ে অধিক আয় নিশ্চিত করার কৌশল গ্রহণ করতে হবে।
তিনি মনে করেন, প্রবাসী শ্রমিকদের কেবল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মাধ্যম হিসেবে না দেখে দেশের মানবসম্পদ, অর্থনৈতিক কূটনীতি এবং জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন মালয়েশিয়া সফর বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে। তবে সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই অভিবাসন সংস্কার বাস্তবায়ন করাই হবে প্রকৃত সাফল্য।
সূত্র: ড. সেলিম রেজার বিশ্লেষণধর্মী মতামত।

