ঢাকা, ৬ জুন ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থানে। চলতি বছরের মার্চ থেকে মে—এই তিন মাসে বিদেশে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে যাওয়া বাংলাদেশি কর্মীর সংখ্যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৪১ শতাংশ কমে গেছে। তবে বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে রেমিট্যান্স প্রবাহে, যেখানে একই সময়ে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ থেকে মে পর্যন্ত বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য গেছেন ১ লাখ ৫৩ হাজার ৬৩৬ জন বাংলাদেশি। গত বছরের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৬০ হাজার ৪৩৮ জন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বিদেশগামী কর্মীর সংখ্যা কমেছে প্রায় ১ লাখ ৭ হাজার, যা শতকরা হিসেবে প্রায় ৪১ শতাংশ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকেই শ্রমবাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া উত্তেজনা ধীরে ধীরে পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ায় জনশক্তি রপ্তানির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। তারা মনে করছেন, বর্তমানে যে পতন দেখা যাচ্ছে, তা কেবল শুরু মাত্র; পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে আগামী মাসগুলোতে সংকট আরও গভীর হতে পারে।
‘প্রকৃত প্রভাব সামনে আরও স্পষ্ট হবে’
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজ (বায়রা)-এর সদস্য সচিব আলী হায়দার চৌধুরী বলেন, বর্তমানে যারা বিদেশে যাচ্ছেন, তাদের অধিকাংশের ভিসা, চুক্তি ও নিয়োগ প্রক্রিয়া যুদ্ধ পরিস্থিতি শুরুর আগেই সম্পন্ন হয়েছিল। ফলে নতুন চাহিদা কমে যাওয়ার প্রকৃত প্রভাব আগামী মাসগুলোতে আরও স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হবে।
তিনি বলেন, বর্তমানে সৌদি আরব ছাড়া কার্যত বড় কোনো শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য পুরোপুরি উন্মুক্ত নেই। সংযুক্ত আরব আমিরাতে নিয়োগ কার্যক্রম সীমিত এবং সেখানে ভারতীয় কর্মীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া কাতার ও কুয়েতে সীমিত সংখ্যক কর্মী নিয়োগ হচ্ছে, অন্যদিকে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার এখনও পুরোপুরি চালু হয়নি।
তিনি আরও জানান, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হলেও ভিসা ও কনস্যুলার জটিলতার কারণে বাংলাদেশ সেসব সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারছে না।
তবে হজ মৌসুম শেষে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। সামনে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আয়োজন ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে নতুন করে জনশক্তির চাহিদা সৃষ্টি হতে পারে বলেও মনে করেন তিনি।
কর্মী কমলেও বেড়েছে রেমিট্যান্স
বৈদেশিক কর্মসংস্থানে সংকোচন দেখা দিলেও রেমিট্যান্স প্রবাহে ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রয়েছে। সাধারণত যুদ্ধ বা অনিশ্চয়তার সময় প্রবাসীরা তাদের সঞ্চিত অর্থ দ্রুত দেশে পাঠিয়ে দেওয়ার প্রবণতা দেখান। পাশাপাশি বৈধ চ্যানেলে অর্থ প্রেরণে সরকারের প্রণোদনা ও নজরদারি বৃদ্ধির ইতিবাচক প্রভাবও রেমিট্যান্স বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ থেকে মে—এই তিন মাসে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে এসেছে ১ হাজার ৩০ কোটি ৪৫ লাখ ৪০ হাজার মার্কিন ডলার সমপরিমাণ রেমিট্যান্স।
এর মধ্যে মার্চ মাসে এসেছে ৩৭৫ কোটি ২২ লাখ ১০ হাজার ডলার, এপ্রিলে ৩১২ কোটি ৭৩ লাখ ডলার এবং মে মাসে এসেছে ৩৪২ কোটি ৫০ লাখ ৩০ হাজার ডলার।
অন্যদিকে গত বছরের একই তিন মাসে দেশে এসেছিল ৯০১ কোটি ৭৫ লাখ ২০ হাজার ডলার। ফলে এক বছরের ব্যবধানে মার্চ-মে সময়ে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে প্রায় ১২৯ কোটি ১০ লাখ ডলার, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করছে।
শ্রমবাজার বৈচিত্র্যকরণের তাগিদ
বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক কর্মসংস্থানের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। ফলে ওই অঞ্চলের যেকোনো রাজনৈতিক বা সামরিক অস্থিরতা সরাসরি দেশের জনশক্তি রপ্তানি খাতে প্রভাব ফেলে।
অর্থনীতিবিদ ও খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের ওপর অতিনির্ভরতা কমিয়ে দ্রুত শ্রমবাজার বৈচিত্র্যকরণ এখন সময়ের দাবি। তারা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার দ্রুত চালু করা, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দক্ষতাভিত্তিক বাজারে প্রবেশ বাড়ানো এবং ইউরোপে নতুন সুযোগ কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
এছাড়া দীর্ঘমেয়াদে ভাষা শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণ এবং কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদারের মাধ্যমে নতুন শ্রমবাজার সৃষ্টি না করতে পারলে ভবিষ্যতে বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্স—উভয় ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
