ঢাকা, ৬ জুন ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে উপসাগরীয় অঞ্চলের শ্রমবাজারে ব্যাপক ধস এবং দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাত সংঘাতে আরও গভীরভাবে জড়িয়ে পড়লে দেশটিতে বসবাসরত প্রায় ২০ লাখ বাংলাদেশি অভিবাসী কর্মীর জীবন ও জীবিকা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে অভিবাসনবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিট (রামরু)।
জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত ‘ইরান ও উপসাগরীয় অঞ্চলের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি: বাংলাদেশি অভিবাসী কর্মীদের ওপর প্রভাব ও করণীয়’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে এ উদ্বেগ তুলে ধরা হয়। এতে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির শিক্ষক ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন শিকদার।
উপসাগরীয় অঞ্চলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে বড় ঝুঁকি
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, চলমান সংঘাতের কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ কার্যক্রমে ব্যাপক স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। এর প্রভাব পড়তে পারে সৌদি আরবের ‘ভিশন ২০৩০’ কর্মসূচির আওতায় বাস্তবায়নাধীন বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পগুলোতেও।
রামরুর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ৫০০ বিলিয়ন ডলারের নিওম সিটি, রেড সি ট্যুরিজম প্রকল্প এবং কিদ্দিয়া এন্টারটেইনমেন্ট সিটির মতো মেগা প্রকল্পে বাংলাদেশের লাখো নির্মাণ ও পরিষেবা খাতের কর্মীর দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা ছিল। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা, ব্যয় বৃদ্ধি কিংবা অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হলে এসব কর্মসংস্থানের সুযোগ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
নারী গৃহকর্মীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে
রামরুর প্রতিবেদনে বলা হয়, দক্ষিণ লেবাননে চলমান হামলার কারণে বাংলাদেশি নারী গৃহকর্মীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। নিয়োগকর্তার অনুমতি ছাড়া বাসার বাইরে বের হওয়ার সুযোগ না থাকায় অনেকেই নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে পারছেন না।
প্রতিষ্ঠানটির মতে, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে নারী অভিবাসী কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত বিশেষ সহায়তা ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন।
মজুরি কর্তন, কাজ কমে যাওয়া ও বেতন বিলম্বের অভিযোগ
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে মধ্যপ্রাচ্যের লজিস্টিকস ও পরিষেবা খাতে কর্মসংস্থান উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। স্থানীয়দের ব্যয় সংকোচনের ফলে কর্মীদের কাজের সুযোগ হ্রাস পেয়েছে এবং অনেকেই মজুরি কর্তনের শিকার হচ্ছেন।
এছাড়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বেতন প্রদানে ৪ থেকে ৫ দিন পর্যন্ত বিলম্ব হচ্ছে, নিয়মিত কাজের শিফট কমে গেছে এবং ওভারটাইম সুবিধা প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে বলে দাবি করা হয়।
নিহত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ নিয়ে উদ্বেগ
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, চলমান সংঘাতের মধ্যে এ পর্যন্ত ১১ জন বাংলাদেশি কর্মীর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তবে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে রামরু।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, এখন পর্যন্ত জিসিসিভুক্ত কোনো দেশের সরকার নিহত বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করেনি। বিষয়টি দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে সমাধান না হলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জোরালোভাবে উত্থাপন করার আহ্বান জানানো হয়।
দেশে ফিরতেও ভোগান্তি
রামরু জানায়, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিমান চলাচল ব্যাহত হওয়ায় অনেক রুটে টিকিটের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। ফলে দেশে ফিরতে আগ্রহী কর্মীরা আর্থিক সংকটে পড়ছেন।
সংগঠনটির দাবি, ঢাকা বিমানবন্দরে প্রতিদিন আগত যাত্রীদের একটি বড় অংশ ফ্লাইট বাতিলের তথ্য না জেনেই বিমানবন্দরে এসে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। একই সঙ্গে নতুন ভিসা কার্যক্রম আটকে যাওয়ায় প্রায় ৮ থেকে ১০ হাজার কর্মী ও তাদের পরিবার আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
সরকারের প্রস্তুতিতে ঘাটতির অভিযোগ
সংবাদ সম্মেলনে সরকারের বিদ্যমান সংকট মোকাবিলা ব্যবস্থার সমালোচনা করে বলা হয়, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে চাকরি হারানো বা বাধ্য হয়ে দেশে ফিরে আসা অভিবাসীদের জন্য কোনো নির্দিষ্ট ‘সংকট-প্রতিক্রিয়া তহবিল’ নেই।
এছাড়া প্রত্যাবর্তনকারী কর্মীদের সংখ্যা ও অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য কোনো রিয়েল-টাইম ড্যাশবোর্ড বা সুসংগঠিত পুনর্বাসন মডিউলও এখনো গড়ে ওঠেনি। ফ্লাইটের টিকিট কেনার শর্ত থাকায় প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের অনেক জরুরি ঋণ কার্যক্রমও কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ করা হয়।
পাঁচ দফা জরুরি সুপারিশ
সংবাদ সম্মেলনে রামরুর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ার ড. তাসনিম সিদ্দিকী প্রবাসী কর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পাঁচটি জরুরি সুপারিশ তুলে ধরেন।
সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- জিসিসিভুক্ত প্রতিটি দেশে বাংলাদেশ দূতাবাসের অধীনে বিশেষ অভিবাসী সংকট সেল ও ২৪ ঘণ্টার বাংলা হটলাইন চালু করা।
- রাজস্ব বাজেট থেকে জরুরি তহবিল গঠন এবং টিকিট ছাড়াই প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের মাধ্যমে অস্থায়ী ঋণ সুবিধা দেওয়া।
- যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফেরত আসা কর্মীদের জন্য জাতীয় পুনর্বাসন নীতি, কাউন্সেলিং ও দক্ষতা সনদ প্রদানের ব্যবস্থা করা।
- নারী গৃহকর্মীদের বকেয়া বেতন আদায়, আইনি সহায়তা ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য বিশেষ গাইডলাইন প্রণয়ন করা।
- নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান এবং কর্মীদের ভাষাগত ও কারিগরি দক্ষতা উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি গ্রহণ করা।
রামরুর মতে, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংকট শুধু একটি আঞ্চলিক সংঘাত নয়; এটি বাংলাদেশের অভিবাসন, শ্রমবাজার ও রেমিট্যান্স অর্থনীতির জন্যও একটি বড় সতর্কবার্তা। তাই সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব মোকাবিলায় এখন থেকেই কার্যকর প্রস্তুতি গ্রহণ করা জরুরি।
