ঢাকা, ১ জুলাই ২০২৬
মাত্র চার বছরের ব্যবধানে মালয়েশিয়ার বিদেশি শ্রমবাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। একসময় দেশটির সবচেয়ে বড় শ্রমশক্তি সরবরাহকারী ছিল বাংলাদেশ। তবে বর্তমানে সেই অবস্থান দখল করেছে ইন্দোনেশিয়া। একই সঙ্গে বিদেশি কর্মী নিয়োগের সংখ্যা নাটকীয়ভাবে কমে এসেছে এবং পুরো নিয়োগব্যবস্থা দ্রুত ডিজিটাল ও কঠোর নিয়ন্ত্রণভিত্তিক কাঠামোয় রূপ নিচ্ছে।
মঙ্গলবার (৩০ জুন) মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাতুক সেরি সাইফুদ্দিন নাসুশন ইসমাইল পার্লামেন্টে লিখিত জবাবে এসব তথ্য জানিয়েছেন। কোটা মেলাকা আসনের সংসদ সদস্য খু পোয়ে তিয়ংয়ের প্রশ্নের উত্তরে তিনি ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিদেশি কর্মীদের দেশভিত্তিক আগমনের পরিসংখ্যান এবং নিয়োগব্যবস্থার সংস্কার সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরেন।
২০২৫ সালে বিদেশি কর্মী আগমন ৯১ শতাংশ কম
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মালয়েশিয়ায় মোট ৭৭ হাজার ৮০৭ জন বিদেশি কর্মী প্রবেশ করেছেন। যা ২০২৩ সালের তুলনায় প্রায় ৯১ শতাংশ কম।
২০২৫ সালে দেশভিত্তিক আগমনের চিত্র:
- ইন্দোনেশিয়া: ৩৫,০১১ জন (৪৫ শতাংশ)
- নেপাল: ২৫,০২৬ জন (৩২.২ শতাংশ)
- ভারত: ৬,২৪৫ জন (৮ শতাংশ)
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এবার বাংলাদেশ শীর্ষ তিন শ্রমশক্তি সরবরাহকারী দেশের তালিকায় স্থান পায়নি।
২০২৩ সালে রেকর্ড গড়েছিল বাংলাদেশ
কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে শ্রমবাজার পুনরায় চালু হওয়ার পর বাংলাদেশ থেকে বিপুল সংখ্যক কর্মী মালয়েশিয়ায় যান।
ইমিগ্রেশন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে মালয়েশিয়ায় মোট ৮ লাখ ৬৭ হাজার ৭৩১ জন বিদেশি কর্মী প্রবেশ করেন। এর মধ্যে বাংলাদেশ থেকেই যান ৩ লাখ ৯৭ হাজার ৫৪৮ জন, যা মোট বিদেশি কর্মীর প্রায় ৪৬ শতাংশ।
একই সময়ে:
- নেপাল থেকে আসে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৮৯৫ জন
- ইন্দোনেশিয়া থেকে আসে ১ লাখ ২২ হাজার ৯০৮ জন
এটি ছিল বাংলাদেশের জন্য একটি রেকর্ড।
কেন কমে গেল নিয়োগ?
রেকর্ড সংখ্যক কর্মী পাঠানোর পরই সামনে আসে অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়, সীমিতসংখ্যক রিক্রুটিং এজেন্সির প্রভাব, চাকরি না পাওয়া, ঋণের বোঝা এবং শ্রমিক শোষণের মতো নানা অভিযোগ। এসব বিষয় আন্তর্জাতিক মহলেও উদ্বেগের সৃষ্টি করে।
এর প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের মাঝামাঝি মালয়েশিয়া সরকার নতুন বিদেশি কর্মী নিয়োগে কড়াকড়ি আরোপ করে। সরকার জানায়, বিদ্যমান কোটার ব্যবহার, শ্রমবাজারের ভারসাম্য এবং নিয়োগব্যবস্থার সংস্কার সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত নতুন নিয়োগ সীমিত রাখা হবে।
ফলে ২০২৪ সালে বিদেশি কর্মী আগমন কমে ৩ লাখ ৫৬ হাজার ৯৭২ জনে নেমে আসে।
সেই বছর:
- ইন্দোনেশিয়া থেকে আসে ১ লাখ ২৪ হাজার ১০৭ জন (৩৪.৮ শতাংশ)
- ভারত থেকে ৭৮ হাজার ৪৭৫ জন
- কাজাখস্তান থেকে ৫১ হাজার ৩৬২ জন
এরপর ২০২৫ সালে বিদেশি কর্মী আগমন আরও কমে দাঁড়ায় মাত্র ৭৭ হাজার ৮০৭ জনে।
ডিজিটাল হচ্ছে পুরো নিয়োগ ব্যবস্থা
মালয়েশিয়া সরকার জানিয়েছে, বিদেশি কর্মী নিয়োগ এখন আরও প্রযুক্তিনির্ভর ও স্বচ্ছ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে বিদেশি কর্মীর কোটা আবেদন সম্পূর্ণ অনলাইনে গ্রহণ করা হচ্ছে। ফলে নিয়োগদাতাদের কেবল একবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাক্ষাৎকারে অংশ নিতে হচ্ছে। সরকারের মতে, এতে সময়, ব্যয় এবং প্রশাসনিক জটিলতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।
দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত ফরেন ওয়ার্কার্স সেন্ট্রালাইজড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (FWCMS)-এর স্বচ্ছতা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন ওঠায় সরকার নতুন ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে।
আলোচনায় TURAP ও NIISe
২০২৬ সালে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে ইউনিভার্সাল রিক্রুটমেন্ট অ্যাডভান্সড প্ল্যাটফর্ম (TURAP)।
সরকারের দাবি, এই প্ল্যাটফর্ম নিয়োগ প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত, প্রযুক্তিনির্ভর ও কার্যকর করবে। তবে কয়েকজন সংসদ সদস্য ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা এর স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বাস্তবায়নের আগে পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছেন।
এছাড়া সরকার দীর্ঘমেয়াদে ন্যাশনাল ইন্টিগ্রেটেড ইমিগ্রেশন সিস্টেম (NIISe) চালুর পরিকল্পনা নিয়েছে। এর মাধ্যমে বিদেশি কর্মী নিয়োগ, ভিসা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং অভিবাসন-সংক্রান্ত সব সেবা একটি সমন্বিত ডিজিটাল কাঠামোর আওতায় আনা হবে।
বাংলাদেশের জন্য কী বার্তা?
অভিবাসন ও শ্রমবাজার বিশ্লেষকদের মতে, মালয়েশিয়ার এই পরিবর্তন সাময়িক নয়; বরং এটি দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সংস্কারের অংশ।
তাদের মতে, ভবিষ্যতে শুধু বেশি সংখ্যক কর্মী পাঠালেই হবে না। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে নিশ্চিত করতে হবে—
- আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ও স্বচ্ছ নিয়োগ ব্যবস্থা;
- অভিবাসন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো;
- দক্ষ ও প্রযুক্তিনির্ভর জনশক্তি তৈরি;
- আন্তর্জাতিক শ্রমমান অনুসরণ এবং তথ্যভিত্তিক যাচাই ব্যবস্থা।
প্রবাসীদের মতামত
মালয়েশিয়ায় কর্মরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের মতে, গত দুই বছরে নিয়োগ কমে যাওয়ায় শ্রমবাজারে কিছুটা অনিশ্চয়তা তৈরি হলেও এটিকে স্থায়ী সংকট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
তাদের ধারণা, সরকার বর্তমানে নিয়োগব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করছে। নতুন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, কেন্দ্রীয় তথ্য যাচাই এবং কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর হলে ধীরে ধীরে শ্রমবাজার আবারও স্থিতিশীল হবে।
ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা
ব্যবসায়ীদের মতে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অভিবাসন ব্যয় কমানো, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে নীতিগত সমন্বয় আরও শক্তিশালী করা।
তাদের বিশ্বাস, সরকার ও বেসরকারি খাত সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারলে বাংলাদেশ আবারও মালয়েশিয়ার অন্যতম প্রধান শ্রমশক্তি সরবরাহকারী দেশে পরিণত হতে পারবে।
উপসংহার
বিশ্লেষকদের মতে, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধ হয়নি; বরং এটি একটি নতুন ডিজিটাল ও নিয়ন্ত্রিত যুগে প্রবেশ করেছে। ভবিষ্যতে সাফল্য নির্ভর করবে শুধু কতজন কর্মী পাঠানো হলো তার ওপর নয়, বরং কতটা স্বচ্ছ, নিরাপদ, দক্ষ এবং কম ব্যয়ে তাদের বিদেশে পাঠানো সম্ভব হলো—সেই সক্ষমতার ওপর।

