বুধবার, ২৭শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ১০ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

ঢাকা, ২ জুন ২০২৬

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি তৈরি পোশাকশিল্প ও প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা কিংবা অভ্যন্তরীণ সংকটের সময়েও দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখা, আমদানি ব্যয় মেটানো এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখতে প্রবাসীদের অবদান অপরিসীম। প্রতি বছর প্রবাসীরা গড়ে ২০ থেকে ২২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার দেশে পাঠান, যা জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম শক্তি হিসেবে বিবেচিত।

তবে অর্থনীতিবিদরা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন, একটি বা দুটি খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। বিশেষ করে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে রেমিট্যান্সের বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর হওয়ায় সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিয়ে বাড়ছে শঙ্কা

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা এবং এর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ায় ওই অঞ্চলে কর্মরত প্রায় ৬০ লাখ বাংলাদেশি প্রবাসীর ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে কর্মসংস্থান, আয় এবং রেমিট্যান্সপ্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিদেশগামী বাংলাদেশি কর্মীদের প্রায় ৬৭ শতাংশ সৌদি আরবে গেছেন। এছাড়া কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও জর্ডানেও বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মরত রয়েছেন। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে যেকোনো দীর্ঘস্থায়ী সংকট সরাসরি বাংলাদেশের শ্রমবাজারকে প্রভাবিত করতে পারে।

রেমিট্যান্সনির্ভর অর্থনীতির ঝুঁকি

অর্থনীতিবিদদের মতে, রেমিট্যান্স বাংলাদেশের জন্য আশীর্বাদ হলেও এর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে রাজনৈতিক অস্থিরতা, যুদ্ধ কিংবা তেলের দাম কমে গেলে কর্মসংস্থান সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অতীতে লিবিয়া ও ইরাকের সংকটের সময় হাজার হাজার বাংলাদেশি কর্মী দেশে ফিরতে বাধ্য হয়েছিলেন।

আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো অদক্ষ শ্রমিকের আধিক্য। বিদেশে যাওয়া বাংলাদেশিদের বড় অংশই অদক্ষ বা স্বল্পদক্ষ শ্রমিক হওয়ায় তাদের আয় তুলনামূলক কম। প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যৎ শ্রমবাজারে অটোমেশন বাড়লে এই শ্রেণির কর্মীদের চাহিদা আরও কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

আমিরাতে ভিসা সংকটে বিপাকে বাংলাদেশিরা

সংযুক্ত আরব আমিরাতে দীর্ঘদিন ধরে ভিসা ট্রান্সফার ও নবায়নসংক্রান্ত জটিলতায় হাজার হাজার বাংলাদেশি প্রবাসী চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন।

প্রবাসীদের অভিযোগ, চাকরি পরিবর্তনের প্রয়োজন হলে অনেক ক্ষেত্রেই তারা বৈধভাবে নতুন প্রতিষ্ঠানে যোগদানের সুযোগ পাচ্ছেন না। ফলে অনেকে বৈধতা হারানোর ঝুঁকিতে পড়ছেন। ভিসা নবায়ন করতে না পেরে প্রতিদিন জরিমানা, গ্রেপ্তার কিংবা দেশে ফেরত পাঠানোর আশঙ্কায় জীবনযাপন করছেন বহু কর্মী।

একজন প্রবাসীর সংকট শুধু তার ব্যক্তিগত সমস্যা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি পরিবার, সন্তানের শিক্ষা, চিকিৎসা ও ভবিষ্যৎ জীবিকার প্রশ্ন। তাই এই সংকটকে কেবল প্রশাসনিক সমস্যা নয়, জাতীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন

প্রবাসী ও ব্যবসায়ী মহলের অভিযোগ, বিভিন্ন সময়ে উচ্চপর্যায়ের সফর ও বৈঠক হলেও বাস্তব সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও সংযুক্ত আরব আমিরাতের শ্রমবাজারে দীর্ঘদিনের জটিলতা কাটেনি।

প্রবাসী ব্যবসায়ীদের মতে, নতুন শ্রমিকের প্রবেশ সীমিত হওয়া এবং ভিসা ট্রান্সফার সমস্যার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় জনবল পাচ্ছে না। এতে শ্রমবাজারে বাংলাদেশিদের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় শ্রমবাজারের চাহিদা যথাযথভাবে মূল্যায়ন না করা এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে ঘাটতির কারণেই এই সংকট দীর্ঘায়িত হচ্ছে।

কর্মী যাওয়া কমেছে, বাড়ছে উদ্বেগ

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতার কারণে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোতে বাংলাদেশি কর্মী যাওয়ার হারও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

ফ্লাইট সংকট, ভিসা জটিলতা এবং ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার কারণে অনেক অভিবাসনপ্রত্যাশী বিদেশযাত্রা স্থগিত করছেন। একই সময়ে বাহরাইন, ওমানসহ কয়েকটি দেশে বাংলাদেশিদের জন্য শ্রমবাজার দীর্ঘদিন ধরে সীমিত বা বন্ধ রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে বৈদেশিক কর্মসংস্থানে বড় ধরনের ধস নামতে পারে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে দেশের রেমিট্যান্সপ্রবাহ ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে।

বিকল্প শ্রমবাজার ও দক্ষতা উন্নয়নে জোর দেওয়ার আহ্বান

শ্রমবাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বর্তমান সংকট বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। শুধু মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর শ্রম অভিবাসনের পরিবর্তে ইউরোপ, পূর্ব এশিয়া, আফ্রিকা ও অন্যান্য সম্ভাবনাময় অঞ্চলে নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান করতে হবে।

একই সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর বৈশ্বিক শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনশক্তি গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করছেন তারা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংকটকে শুধু বিপর্যয় হিসেবে দেখলে চলবে না। ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এটিকে শিক্ষা হিসেবে গ্রহণ করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠন কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সুযোগ কাজে লাগাতে এখন থেকেই কৌশলগত প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন।

প্রবাসীদের স্বার্থেই জরুরি কার্যকর উদ্যোগ

সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, প্রবাসীদের স্বার্থ রক্ষায় দ্রুত ও কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া এখন সময়ের দাবি। বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজারে ভিসা ট্রান্সফার, নবায়ন ও নতুন কর্মী নিয়োগসংক্রান্ত জটিলতা দূর করতে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা জোরদার করা প্রয়োজন।

কারণ প্রবাসীরা শুধু বৈদেশিক মুদ্রার যোগানদাতা নন; দেশের লাখো পরিবারের জীবন-জীবিকা এবং জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। তাদের ভবিষ্যৎ নিরাপদ করা মানেই দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা।

Leave A Reply

বৈদেশিক কর্মসংস্থান, অভিবাস ও প্রবাস জীবন সংক্রান্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল।

যোগাযোগ

সিটি হার্ট শপিং কমপ্লেক্স (১১তম ফ্লো), রুম ১২/৮, ৬৭, নয়াপল্টন, ভিআইপি রোড, ঢাকা-১০০০, ফোন: +৮৮০ ১৫৩৩-১৯০৩৭১, ইমেইল: info@probashbulletin.com

Exit mobile version