ঢাকা, ৯ জুলাই ২০২৬

বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আবারও মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খুলে দেওয়ার ঘোষণা এসেছে। সরকারের দাবি, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক মালয়েশিয়া সফরে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের আলোচনার ফলেই এ অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের আশা, আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যেই নতুন করে বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর কার্যক্রম শুরু হবে।

তবে অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, শুধু শ্রমবাজার চালু হওয়াই যথেষ্ট নয়; নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ এবং অভিবাসন ব্যয় কমানো নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

কেন গুরুত্বপূর্ণ মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার?

মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে বাংলাদেশি কর্মীদের অন্যতম বৃহৎ কর্মসংস্থানের গন্তব্য মালয়েশিয়া। দেশটির নির্মাণ, উৎপাদনশিল্প, পাম অয়েল বাগান, কৃষি, সেবা, পরিচ্ছন্নতা, পরিবহন ও উৎপাদনমুখী বিভিন্ন খাতে দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশি কর্মীরা কাজ করে আসছেন।

তুলনামূলক ভালো বেতন, ওভারটাইমের সুযোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থানের কারণে মালয়েশিয়া বাংলাদেশিদের কাছে অন্যতম আকর্ষণীয় শ্রমবাজার। একই সঙ্গে এই শ্রমবাজার দেশের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

কেন বারবার বন্ধ হয়েছে শ্রমবাজার?

গত প্রায় তিন দশকে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া শ্রমবাজার একাধিকবার বন্ধ হয়েছে।

  • ২০০৮ সালে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে প্রথমবার শ্রমবাজার বন্ধ হয়।
  • ২০১৬ সালে সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি প্লাস) ব্যবস্থায় পুনরায় চালু হলেও কাঙ্ক্ষিত স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয়নি।
  • ২০১৮ সালে সীমিতসংখ্যক রিক্রুটিং এজেন্সির সিন্ডিকেট, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় ও অনিয়মের অভিযোগে আবারও নিয়োগ স্থগিত করা হয়।
  • ২০২১ সালে নতুন সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সইয়ের পর ২০২২ সালের আগস্টে কর্মী পাঠানো শুরু হলেও মাত্র ২৫টি এজেন্সিকে অনুমতি দেওয়ায় নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হয়।
  • সর্বশেষ ২০২৪ সালের ১ জুন প্রশাসনিক জটিলতা ও সময়সীমা সংক্রান্ত কারণে মালয়েশিয়া বাংলাদেশি কর্মীদের নতুন প্রবেশ বন্ধ করে দেয়। ফলে হাজারো কর্মী ভিসা, মেডিকেল ও টিকিট সম্পন্ন করেও যেতে পারেননি।

এবার কী পরিবর্তন আসছে?

সরকার জানিয়েছে, এবার কর্মী নিয়োগে আগের মতো সীমিতসংখ্যক এজেন্সির ওপর নির্ভরশীলতা থাকবে না। রিক্রুটিং এজেন্সি নির্বাচন করবে বাংলাদেশ সরকার এবং পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও সিন্ডিকেটমুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

সরকারের লক্ষ্য, আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যে কম খরচে বা নির্ধারিত সরকারি ব্যয় কাঠামোর মধ্যে কর্মী পাঠানোর কার্যক্রম শুরু করা।

সরকারের সতর্কবার্তা

এদিকে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, সরকার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা রিক্রুটিং এজেন্সির সঙ্গে অর্থ লেনদেন, চুক্তি, মেডিকেল পরীক্ষা কিংবা পাসপোর্ট জমা দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।

এক জরুরি সতর্কতামূলক বিজ্ঞপ্তিতে মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সরকারি অনুমোদনের আগে কোনো রিক্রুটিং এজেন্সি কর্মীদের কাছ থেকে অর্থ গ্রহণ, পাসপোর্ট সংগ্রহ বা চুক্তি করতে পারবে না। সরকার আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত জানালে সেটি গণমাধ্যম ও সরকারি মাধ্যমে প্রকাশ করা হবে।

আটকে থাকা প্রায় ৮ হাজার কর্মীর কী হবে?

২০২৪ সালে শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে যাওয়ার সময় সরকারি হিসাবে ৭ হাজার ৮৭৩ জন বাংলাদেশি কর্মী সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেও মালয়েশিয়ায় যেতে পারেননি। তাদের অনেকেই ঋণ নিয়েছেন, জমি বিক্রি করেছেন কিংবা ধার করে বিদেশ যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন।

পরে এসব কর্মীকে পর্যায়ক্রমে পাঠানোর দায়িত্ব দেওয়া হয় বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল)-কে। এখন পর্যন্ত প্রায় ৩ হাজার কর্মী মালয়েশিয়ায় যেতে সক্ষম হলেও কয়েক হাজার কর্মী এখনও অপেক্ষায় রয়েছেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন শ্রমবাজার চালুর পর আটকে থাকা এসব কর্মীকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পাঠানোর ব্যবস্থা করা জরুরি।

কী কী চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে?

বিশ্লেষকদের মতে, সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় পূর্ণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়, দালালচক্র, সিন্ডিকেট এবং চুক্তি লঙ্ঘনের মতো পুরোনো সমস্যাগুলো দূর করতে কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন।

চলতি বছরের শুরুতে মালয়েশিয়া বিদেশি কর্মী নিয়োগে একটি ডিজিটাল ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিলেও পরে বিভিন্ন বিতর্কের কারণে সেই পরিকল্পনা বাতিল করা হয়। ফলে নতুন কাঠামো কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

বিশেষজ্ঞের মত

বায়রার সাবেক মহাসচিব মো. ফখরুল ইসলাম বলেন, মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে সিন্ডিকেটমুক্ত ও স্বল্প ব্যয়ের প্রক্রিয়া নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

তার মতে, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার টেকনিক্যাল কমিটির আলোচনার মাধ্যমে এমন একটি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কোনো ধরনের সিন্ডিকেট গড়ে উঠতে না পারে এবং কর্মীরা কম খরচে বৈধভাবে মালয়েশিয়ায় যেতে পারেন।

অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাবের আশা

রেমিট্যান্স বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস। সাম্প্রতিক সময়ে মালয়েশিয়া থেকে রেমিট্যান্স প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সরকারের তথ্য অনুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে মালয়েশিয়া থেকে ২ দশমিক ৮০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, শ্রমবাজার পুরোপুরি সচল হলে শুধু কর্মসংস্থানই নয়, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

তবে অতীতের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শ্রমবাজার পুনরায় চালুর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, দালালমুক্ত ব্যবস্থা এবং দুই দেশের কার্যকর সমন্বয়ের ওপর।

Leave A Reply

বৈদেশিক কর্মসংস্থান, অভিবাস ও প্রবাস জীবন সংক্রান্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল।

যোগাযোগ

সিটি হার্ট শপিং কমপ্লেক্স (১১তম ফ্লো), রুম ১২/৮, ৬৭, নয়াপল্টন, ভিআইপি রোড, ঢাকা-১০০০, ফোন: +৮৮০ ১৫৩৩-১৯০৩৭১, ইমেইল: info@probashbulletin.com

Exit mobile version