নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগের জন্য ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা প্রকাশ করেছে দেশটির বিদেশি কর্মী নিয়োগের প্ল্যাটফর্ম ফরেন ওয়ার্কার্স সেন্ট্রালাইজড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (FWCMS)। শুক্রবার (২১ আগস্ট) প্ল্যাটফর্মটির ওয়েবসাইটে বাংলাদেশের এসব রিক্রুটিং এজেন্সির নাম তালিকাভুক্ত করা হয়।

তবে তালিকা প্রকাশ হলেও কবে থেকে, কী প্রক্রিয়ায় এবং কোন শর্তে বাংলাদেশি কর্মীদের নতুন করে মালয়েশিয়ায় পাঠানো হবে—এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত স্পষ্ট হয়নি। ফলে ২৫টি এজেন্সির তালিকা প্রকাশকে শ্রমবাজার পুরোপুরি পুনরায় খোলার সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা।

তালিকায় থাকা ২৫ এজেন্সি

FWCMS-এর তালিকায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—বাংলাদেশ ওয়ান ওভারসিজ লিমিটেড, বেঙ্গল হিউম্যান রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট, জেনারেল ট্রেডিং কোম্পানি, মেসার্স ইউনাইটেড গালফ সার্ভিসেস, অ্যানেসা এয়ার ইন্টারন্যাশনাল, আত-তাকওয়া ওভারসিজ লিমিটেড, আর্থ-স্মার্ট বাংলাদেশ লিমিটেড, খান জাহান আলী ওভারসিজ, মেসার্স আল-শোতুপ ওভারসিজ, মাদারল্যান্ড ওভারসিজ লিমিটেড, রিফা ইন্টারন্যাশনাল, ভেলি ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, এ-প্লাস ইন্টারন্যাশনাল, আল-হায়াত ওভারসিজ, ভালুকা ওভারসিজ, ব্রাদার্স ট্রেডিং অ্যান্ড কন্ট্রাক্টিং লিমিটেড, চাঁদপুর ইন্টারন্যাশনাল, কান্ট্রি এমপ্লয়মেন্ট এজেন্সি, গুডনেস সার্ভিসেস লিমিটেড, জুয়েল রিঙ্কু এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স সাতক্ষীরা ইন্টারন্যাশনাল, ম্যানগ্রোভ ক্যারিয়ার লিঙ্ক, নেবারস অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেড, তানিয়া ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল এবং অ্যাঙ্কর কেয়ার গ্লোবাল মাইগ্রেশন।

২৫ এজেন্সি নিয়ে নতুন করে ‘সিন্ডিকেট’ বিতর্ক

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে অতীতে সীমিতসংখ্যক রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী পাঠানোর ব্যবস্থা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা ও সিন্ডিকেটের অভিযোগ ছিল। এবার ২৫টি এজেন্সির নাম প্রকাশের পর নতুন করে একই ধরনের কাঠামো গড়ে ওঠার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানিকারকদের একটি অংশ। তারা সব যোগ্য রিক্রুটিং এজেন্সির জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার উন্মুক্ত রাখার দাবি জানিয়ে আসছেন। সাম্প্রতিক সময়েও মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে স্বচ্ছতা ও মধ্যস্বত্বভোগী নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

বিশেষ করে নতুন নিয়োগ ব্যবস্থায় সীমিতসংখ্যক এজেন্সিকে সুযোগ দেওয়া হলে অভিবাসন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি অতীতের অনিয়ম ফিরে আসতে পারে—এমন উদ্বেগ রয়েছে। মালয়েশিয়া সরকারও ২০২৬ সালে বিদেশি কর্মী নিয়োগ ব্যবস্থাকে আরও ডিজিটাল ও স্বচ্ছ করার উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছে।

দীর্ঘদিন বন্ধ মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার

২০২৪ সালের ৩১ মে নির্ধারিত প্রবেশসীমার পর বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী মালয়েশিয়ায় যেতে পারেননি। সরকারি হিসাবে এ সংখ্যা প্রায় ১৭ হাজারের কাছাকাছি। পরে মালয়েশিয়া প্রথম ধাপে প্রায় ৭ হাজার ৯৬৪ জনকে পাঠানোর প্রক্রিয়া গ্রহণ করে।

চলতি আগস্টেও এই আটকে থাকা কর্মীদের মালয়েশিয়ায় পাঠানোর প্রক্রিয়ায় অগ্রগতি হয়েছে। ৪ আগস্ট ১৩ সদস্যের একটি মালয়েশীয় প্রতিনিধি দল ঢাকায় এসে এসব কর্মীর প্রশিক্ষণ ও মোতায়েন প্রক্রিয়া তদারক করেছে। মালয়েশিয়া প্রায় ১৮ হাজার এমন কর্মীকে নেওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছে, যারা ২০২৪ সালের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রবেশ করতে পারেননি।

প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরের পরও অনিশ্চয়তা

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২০২৬ সালের ২২ জুন মালয়েশিয়ায় দুই দিনের সরকারি সফর করেন। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের আমন্ত্রণে অনুষ্ঠিত ওই সফরে দুই দেশের সম্পর্কের পাশাপাশি মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও শ্রমবাজারসহ বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়।

এর পরও বাংলাদেশ থেকে নতুন করে কর্মী পাঠানোর পূর্ণাঙ্গ কাঠামো এখনো স্পষ্ট হয়নি। সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু এজেন্সির তালিকা প্রকাশের মাধ্যমে শ্রমবাজার আনুষ্ঠানিকভাবে খুলে যায় না। কর্মী পাঠানোর সংখ্যা, নিয়োগ প্রক্রিয়া, ব্যয়, নিয়োগকর্তার চাহিদা ও অন্যান্য শর্ত নির্ধারণে দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে আরও সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।

১০ শর্তে এজেন্সি বাছাইয়ের প্রক্রিয়া

২০২৫ সালের অক্টোবরে মালয়েশিয়া বাংলাদেশ থেকে কর্মী পাঠানোর জন্য সক্ষম রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা চেয়ে ১০টি বাধ্যতামূলক শর্ত নির্ধারণ করেছিল। এর মধ্যে ছিল নির্দিষ্ট সংখ্যক কর্মী বিদেশে পাঠানোর অভিজ্ঞতা, নিজস্ব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং নির্দিষ্ট আয়তনের স্থায়ী অফিস থাকার মতো শর্ত।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এসব শর্তের কয়েকটি শিথিল করার অনুরোধ করা হয়। পরবর্তী সময়ে নির্ধারিত ১০টি ক্রাইটেরিয়ার মধ্যে সাতটি পূরণকারী ২৬০টি এবং ছয়টি পূরণকারী ১৬৩টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে নিয়ে মোট ৪২৩টি এজেন্সির একটি তালিকা প্রস্তুত করে মালয়েশিয়ার কাছে পাঠানো হয়েছিল।

তবে এখন FWCMS-এর ওয়েবসাইটে ২৫টি এজেন্সির নাম প্রকাশ পাওয়ায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—এই ২৫টি এজেন্সিই কি নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়ার জন্য চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত, নাকি এটি কেবল মালয়েশিয়ার প্ল্যাটফর্মে নিবন্ধিত এজেন্সির তালিকা? FWCMS-এর তালিকায় নাম থাকা সত্ত্বেও নতুন করে কর্মী পাঠানোর পূর্ণাঙ্গ প্রক্রিয়া ও কার্যকর তারিখ এখনো স্পষ্ট নয়।

সামনে কী

সংশ্লিষ্টদের মতে, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার স্থায়ীভাবে ও টেকসইভাবে চালু করতে হলে অতীতের সিন্ডিকেট ও অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়ের অভিযোগ থেকে বের হয়ে একটি স্বচ্ছ, প্রতিযোগিতামূলক ও জবাবদিহিমূলক নিয়োগ কাঠামো নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ শুধু নির্দিষ্ট কিছু এজেন্সিকে তালিকাভুক্ত করে কর্মী পাঠানোর সুযোগ দিলে অভিবাসন ব্যয় ও অনিয়ম নিয়ে আগের বিতর্ক আবারও সামনে আসতে পারে।

এখন মূল নজর থাকবে দুই দেশের যৌথ সিদ্ধান্ত, নতুন নিয়োগ কাঠামো, কর্মীপ্রতি অভিবাসন ব্যয় এবং সব বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির জন্য সুযোগ কতটা উন্মুক্ত রাখা হয়—সেদিকে।

Leave A Reply

বৈদেশিক কর্মসংস্থান, অভিবাস ও প্রবাস জীবন সংক্রান্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল।

যোগাযোগ

সিটি হার্ট শপিং কমপ্লেক্স (১১তম ফ্লো), রুম ১২/৮, ৬৭, নয়াপল্টন, ভিআইপি রোড, ঢাকা-১০০০, ফোন: +৮৮০ ১৫৩৩-১৯০৩৭১, ইমেইল: info@probashbulletin.com

Exit mobile version