প্রবাস বুলেটিন ডেস্ক
বাংলাদেশ ও মালদ্বীপের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক অভিন্ন সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ, ধর্মীয় ও পারিবারিক ঐতিহ্য, সামাজিক বন্ধন এবং জনগণের মধ্যে গভীর যোগাযোগের ওপর প্রতিষ্ঠিত বলে মন্তব্য করেছেন মালদ্বীপে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার ড. মো. নাজমুল ইসলাম। তিনি বলেছেন, মালদ্বীপে বসবাসরত বাংলাদেশিদের কাছে দেশটি অনেকাংশেই ‘দ্বিতীয় বাড়ির’ মতো।
মালদ্বীপের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম ‘সান অনলাইন’-এর ‘ডিপ্লোম্যাটিক ফোকাস’ অনুষ্ঠানে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বাংলাদেশ-মালদ্বীপ সম্পর্কের ক্রমবর্ধমান ব্যাপ্তি তুলে ধরেন। এ সময় দুই দেশের অভিন্ন মূল্যবোধ ও ঘনিষ্ঠ মানবিক সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা আরও জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
দুই দেশের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন প্রবাসীরা
হাইকমিশনার বলেন, মালদ্বীপে কর্মরত বাংলাদেশিরা দুই দেশের সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নির্মাণ, পর্যটন ও সেবা খাতসহ মালদ্বীপের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশি কর্মীরা অবদান রাখছেন। পাশাপাশি তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশি প্রবাসীরা শুধু অর্থনৈতিক অবদান রাখছেন না, বরং দুই দেশের জনগণের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন হিসেবেও কাজ করছেন। তাদের শ্রম, নিষ্ঠা, পেশাদারত্ব এবং স্থানীয় জনগণের সঙ্গে পারস্পরিক যোগাযোগ দুই দেশের মানুষের মধ্যে বোঝাপড়া ও বন্ধুত্ব আরও গভীর করছে।
নিরাপদ শ্রম অভিবাসনে গুরুত্ব
বাংলাদেশ ও মালদ্বীপের মধ্যে নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও টেকসই শ্রম অভিবাসন নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন ড. মো. নাজমুল ইসলাম।
তিনি মালদ্বীপে বসবাসরত অবৈধ বা অনিবন্ধিত বাংলাদেশিদের নিয়মিতকরণ, বায়োমেট্রিক নিবন্ধন, শ্রমিকদের অধিকার ও কল্যাণ সুরক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোর মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।
হাইকমিশনার বলেন, শ্রম সহযোগিতা দুই দেশের সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলেও বাংলাদেশ-মালদ্বীপ সম্পর্ককে এখন আরও বিস্তৃত ও বহুমাত্রিক পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে।
শিক্ষা-স্বাস্থ্য ও পর্যটনেও সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান
দুই দেশের মধ্যে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাণিজ্য, মৎস্য, পর্যটন ও সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা ইতোমধ্যে বিস্তৃত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি ভবিষ্যতে আরও নতুন সুযোগ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন।
তিনি বলেন, দুই দেশের পরস্পর-পরিপূরক সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে শিক্ষা ও একাডেমিক বিনিময়, স্বাস্থ্যসেবা, পর্যটন, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, মৎস্য ও ব্লু ইকোনমি, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, সংস্কৃতি এবং ক্রীড়া কূটনীতির মতো ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও জোরদার করা সম্ভব।
‘পাওয়ার অব বন্ডিং’ জোরদারে হাইকমিশনের উদ্যোগ
দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়াতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন হাইকমিশনার। তিনি জানান, স্কুলভিত্তিক কার্যক্রম, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, জাতীয় দিবস উদযাপন, কমিউনিটি আউটরিচ এবং বিভিন্ন জনসম্পৃক্ত কর্মসূচির মাধ্যমে মালদ্বীপের জনগণ ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ জোরদার করা হচ্ছে।
ড. মো. নাজমুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ-মালদ্বীপ সম্পর্ক শুধু সরকার-থেকে-সরকার পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়। জনগণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, পেশাজীবী ও সামাজিক গোষ্ঠীর মধ্যে যোগাযোগও এ সম্পর্ককে ক্রমাগত শক্তিশালী করছে।
১৯৭৮ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক
বাংলাদেশ ও মালদ্বীপ ১৯৭৮ সালের ২২ সেপ্টেম্বর কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে। এরপর থেকে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, অভিন্ন স্বার্থ ও জনগণের মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের ভিত্তিতে দুই দেশ বন্ধুত্বপূর্ণ অংশীদারত্ব গড়ে তুলেছে। সময়ের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিস্তৃত হয়েছে এবং মালদ্বীপে বসবাসরত বৃহৎ বাংলাদেশি প্রবাসী সম্প্রদায় এ সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
হাইকমিশনার পুনর্ব্যক্ত করেন, বাংলাদেশ সরকার মালদ্বীপের সঙ্গে বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয় এবং দুই দেশের সরকার ও জনগণের মধ্যে আস্থা ও বন্ধুত্ব আরও সুদৃঢ় করতে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তিনি বলেন, দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিহিত রয়েছে বিদ্যমান বন্ধুত্ব ও জনগণের মধ্যকার গভীর যোগাযোগকে আরও বিস্তৃত ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতায় রূপান্তরের মধ্যে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ ও মালদ্বীপের অভিন্ন সমৃদ্ধি, পারস্পরিক উন্নয়ন এবং আরও ঘনিষ্ঠ অংশীদারত্বের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব হবে।
হাইকমিশনারের মতে, আস্থা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, মানবিক যোগাযোগ ও জনগণের মধ্যকার সম্পর্ক—অর্থাৎ ‘পাওয়ার অব বন্ডিং’—ভবিষ্যতেও বাংলাদেশ ও মালদ্বীপের দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্বকে আরও শক্তিশালী করার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।

